অধিবেশন ৩: কাদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন- তাদের চিহ্নিত করার কিছু লক্ষণ এবং করণীয়

অধিবেশণ-৩ : কাদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন- তাদের চিহ্নিত করার কিছু লক্ষণ এবং করণীয়

অধিবেশনের উদ্দেশ্য :
এই সেশন শেষে আপনি জানতে পারবেন-
১. মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কাদের প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করতে পারবেন
২. মানসিক সমস্যা এবং মানসিক রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানতে পারবেন
৩. জানার পরে আপনার করণীয় পদক্ষেপ কি হতে পারে তা অনুধাবণ করতে পারবেন।

মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কেন প্রয়োজন
২০১৯ সালে NHI গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ঢাকার মোট প্রাপ্ত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ১৮.৭% গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভোগছে, যাদের অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ’র পরার্মশ নিতে হবে। বাকী আমরা যারা আছি তাদের কোন না কোন সময় মানসিক বির্পযয় আসতে পারে, যা নিজ থেকে সহজে উত্তরণ করা যায় না। কিন্তÍ একটু সহযোগিতা পেলে তা কাটিয়ে উঠা সম্ভব।

বাংলাদেশের পূর্ণবয়সী মানুষের মধ্যে ১৬.১ ভাগের এবং ঢাকা ডিভিশনের শিশু- কিশোরদের মধ্যে শতকরা ১৮.৩৫ ভাগের মানসিক রোগ আছে। যারা সমাজের বঞ্চিত, ও অনগ্রসর শ্রেণীর, যারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে তেমন শিশু- কিশোর ও বড়দের মধ্যে এই হার আরো বেশী হওয়াই স্বাভাবিক। মানসিক সমস্যা এবং মানসিক রোগ এটা যাদের আছে তাদের সবারই মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন।

মানসিক অসুস্থতার ফলে ব্যক্তির উপর অনেক প্রভাব পড়ে। ফলে ব্যক্তির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কম বেশী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে ব্যক্তির উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং কাজ করার সক্ষমতা কমে আসে। কিন্তু যথোপযুক্ত চিকিৎসার ফলে একজন মানসিক রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে এবং সুস্থ জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।

মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করার জন্য আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং মানসিক রোগ স¤পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।

মানসিক সমস্যার কারণসমূূহ :
বিভিন্ন কারণে ব্যক্তির মধ্যে মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে যেমনঃ জৈব রাসায়নিক উপাদানের প্রভাব, জীনের প্রভাব, শারীরিক গঠনগত দুর্বলতার প্রভাব, মস্তিষ্কের ক্ষতিজনিত কারণ, আর্থসামাজিক কারণ ইত্যাদি। তবে গবেষকরা যেসব মনোসামাজিক বিভিন্ন উপাদানের উপর জোর দিয়েছেন, সেগুলি নিম্নরুপ :
– শৈশবকালীন বঞ্চনা
কাছের কারো মৃত্যু
তীব্র বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া,
আশ্রয়কেন্দ্রে বড় হওয়া,পথ শিশু,
অপর্যাপ্ত পিতৃ- মাতৃ স্নেহ
– সামঞ্জস্য শিশু প্রতিপালন পদ্ধতি (কঠোর শাস্তি, অতিরিক্ত প্রশ্রয়দান, বাবামায়ের মাদকাসক্তি ইত্যাদি)
বাবা- মায়ের দাম্পত্য কলহ
ভাইবোনের দ্বন্দ্ব ও কলহ
শিশুর সঙ্গে বাবা- মার ত্রুটিপূর্ণ সম্পর্ক
সামঞ্জস্যহীন সমবয়সী দল
সঠিক নিয়মশৃঙ্খলা বা সঠিক নির্দেশনার অভাব
ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ
ত্রুটিপূর্ণ সামাজিকীকরণ, সমাজের অন্যান্যদের সাথে মেলামেশার সুযোগের অভাব এবং কোন দলের সাথে একাত্মতা অনুভবের অভাব ইত্যাদি।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ : মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ সাধারনত ৪ রকমের হয়ে থাকে যথা :
১. জ্ঞানীয়
২. আবেগীয়
৩. শারীরবৃত্তীয়
৪. এবং আচরণগত

অতিরিক্ত অস্থিরতা, কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, দুশ্চিন্তা, ঘুুমের সমস্যা, অতিরিক্ত ভয় পাওয়া, অপরাধবোধ, নিজেকে ছোট মনে করা, হতাশ ভাব, বিষন্নতা, জীবনে ব্যর্থ মনে করা, আত্মহত্যার চিন্তা, মাথাব্যথা, বুকের মধ্যে চাপ অনুভাব করা, ক্ষুধামন্দা বা অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ দূর্বলতা, বুক ধরফর করা, নিশ্বাস নিতে কষ্ট অনুভত হওয়া, হাত- পা কাঁপা ইত্যাদি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সাধারন লক্ষণ।

মানসিক রোগ ও লক্ষণ সমূহ : কারো মানসিক রোগ হয়েছে কিনা তা বুঝতে হলে নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্য করা দরকার:
– ব্যক্তির মধ্যে কতগুলো মানসিক সমস্যার লক্ষণ থাকবে
– এই লক্ষণগুলো কয়েকমাস বা তার বেশী সময় ধরে উপস্থিত থাকবে
– এই লক্ষণগুলোর মাত্রা যথেষ্ট তীব্র হবে
– মানসিক সমস্যার লক্ষণগুলোর কারণে ব্যক্তির জীবনযাত্রা ভীষণভাবে বিঘ্নিত হবে। যেমন- তার লেখাপড়া, ঘরের কাজ, পেশাগত কাজ, আন্তঃব্যক্তিতে সম্পর্ক, পারিবারিক জীবন, যৌন সম্পর্ক ইত্যাদি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।
– এই লক্ষণগুলো কোন শারীরিক বা নিউরোলজিক্যাল অসুখের কারণে কোন ঔষধের প্রভাবে বা কোন নেশাদ্রব্য বা কোন অ্যালকোহলের কারণে তৈরি হইনি।

উপরের বিষয়গুলো যদি কারো মধ্য থাকে তাহলে বলা যায় তার মানসিক রোগ হবার সম্ভাবনা আছে।

করণীয় পদক্ষেপ সমূহ :
– মানসিক রোগের লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা থাকাটা বিশেষ ভাবে দরকার।
– মানসিক রোগ নির্ণয়ের জন্য মনোরোগ চিকিৎসক বা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে পাঠিয়ে দিলে তারা নামসহ রোগ নির্ণয় করতে পারবেন।
– মানসিক ভাবে অসুস্থ কাউকে পাওয়া গেলে নিজে প্রাথমিক পর্যায়ের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যথাযথ বিশেষজ্ঞদের কাছে রেফার করবেন। কোথায় রেফার করতে হবে বা পাঠাতে হবে তার একটি তালিকা সেশন-১২ তে দেয়া আছে।

৩.১ -হ্যান্ডআউট

কিছু সাধারণ মানসিক অসুস্থতা :
বিষন্নতাঃ (Depression)
একজন মানুষের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য তিন উপাদান প্রয়োজনীয়। এক পরিবার, দুই বন্ধুবান্ধবমহল, ও তিন কর্মজীবন। এই তিনটির যেকোন দুইটি ভালোভাবে থাকলে সাধারণত মানুষ বিষন্নতার কবলে পড়ে না। এই তিনটি যেকোন দুইটির ব্যতয় ঘটলে বিষন্নতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
এটি যেকোন মানসিক অসুস্থতার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত অসুস্থতা। যে কোন মানুষই জীবনের যে কোন সময় যে কোন অঘটনের প্রেক্ষিতে বিষন্নতায় ভুগতে পারে। কিন্তু মানসিক রোগ হিসেবে বিষন্নতাকে তখনই ধরা হবে যখন তাদের মধ্যে মন খারাপ, দুঃখবোধ বা শূন্যতাবোধ চিরস্থায়ী আকার ধারণ করে । আপত দৃষ্টিতে মনে হবে অকারণবসত বিষন্নতা। যেমন তাদের যে ধরণের কাজে পূর্বে আগ্রহ কাজ করত, সে ধরণের কাজে আর আগ্রহ না থাকা। যে কোন কাজে শক্তি হারিয়ে ফেলা, মনোযোগ ধরে রাখতে, আলোচনা চালিয়ে যেতে অথবা সহজ কোন সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হওয়া। কোন কিছুতেই আনন্দবোধ না করা। এর সাথে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবনতা দেখা যেতে পারে। এই ধরণের সমস্যা যখন দীর্ঘদিন কারো মধ্যে দেখা যায় তখন তাকে মানসিক অসুস্থ রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিষন্নতার লক্ষণগুলো দুর করার জন্যঔষধ এবং সাইকোথেরাপি দুইটি বিষয়ই কার্যকর। কারো কারো ক্ষেত্রে বিষন্নতার লক্ষনগুলো কিছুদিন ফিরে আসতে পারে, সেক্ষেত্রে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাটা জরুরী।

উদ্বিগ্নতা : (anxiety)
প্রতিটি মানুষের জীবনে উদ্বিগ্নতা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে যখন উদ্বিগ্নতা মানসিক বৈকল্যের রুপ ধারণ করে তখন তার কর্মজীবন, অন্যের সাথে সম্পর্কের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিকভাবে নিজেকে নিজে সে একা করে ফেলে।

সাধারণত হঠাৎ কোন গন্ডগোলের আওয়াজ পাওয়ার পর ব্যক্তির হৃৎপৃন্ডের স্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যায়, মাংসপেশী শক্ত হয়ে যায় এবং শব্দের উৎসের দিকে মনোযোগ ধাবিত হয়। এটি মানুষের দেহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর অর্থ, শরীর নিজে নিজে যুদ্ধ করার জন্য বা বিপদজনক পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই লক্ষণগুলোই সমস্যার কারণ হয়ে পড়ে যখন কোন সুনির্দিষ্ট এবং অহেতুক কারণ ছাড়াই এগুলো দেখা দেয়। অন্যকথায় বলা যায় যে, যখন কোন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই মানুষের মধ্যে হৃৎপৃন্ডের স্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যাওয়া, মাংসপেশী শক্ত হয়ে যাওয়া, ব্লাড প্রেসার, অহেতুক দুঃশ্চিন্তা ইত্যাদি যখন দৈনন্দিন ঘটনায় রূপ নেয় তখন তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলা যায়। এই অবস্থায় তাঁর কিছু কঠিন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন হার্ট এ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদি। এই অবস্থায় চিকিৎসকের পাশাপাশি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো জরুরি।

১. জিএডি (জেনারেলাইজড এ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার)/সাধারণ উদ্বিগ্নতা বৈকল্য :
সাধারন উদ্বিগ্নতা বৈকল্যতে ব্যক্তির ক্রমাগতভাবে অস্থিরতা অনুভব করা, হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি, মাথা ঘোরানো, অল্পতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, কোন কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়া এবং অতিরিক্ত দ:ুশ্চিন্তা ইত্যাদি অনুভব করা। এই অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট বা সুনির্দিষ্ট নয় কোন ঘটনা থাকে না অথবা বাস্তবিক জীবনের বিপদ মোকাবেলার চেয়ে বেশি পরিমানে হয়। এই অবস্থা একটানা প্রায় ছয় মাসের মত স্থায়ী হয়। ব্যক্তি বিপদমুক্ত হয়ে গেলেও অন্য কোন ছোটখাট বিষয় এসে তার মধ্যে একই ধরনের অনুভুতি তৈরী করে। এই অবস্থা নিয়ন্ত্রন করা ব্যক্তির জন্য অসম্ভব এবং এটি ব্যক্তির বাড়িতে, কাজে বা সামাজিক কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজের সম্পর্কে খুব নিম্ন ধারণা পোষণ করে এবং সারাক্ষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এই রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঔষধ এবং সাইকোথেরাপীর কার্যকারীতা দেখা গেছে।

২. সামাজিক ভীতি :
সামাজিক ভীতি একটি উদ্বিগ্নতা বৈকল্য যাতে ব্যক্তির লজ্জি¦ত, অপমানিত, তাচ্ছিল্যের পাত্র ইত্যাদি হওয়ার জন্য বেশী পরিমানে অস্বস্তি থাকে। এমনকি যখন তারা এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় তার পূর্বে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে অস্বস্থি শুরু হয় বিষয়টি নিয়ে এবং ঐ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে অযথা বিলম্ব করে। এই ধরণের ব্যক্তিরা বেশী অসুবিধায় পড়ে – সবার সামনে কথা বলা, অন্য কারো সাথে সাক্ষাৎ করা, কর্তৃপক্ষস্থানীয় কারো সাথে কথা বলা, জন সমাগম বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া, গনশৌচাগার ব্যবহার ইত্যাদি। এই রোগটিকে অনেক সময় লাজুকতা বলে ভুল ধারণা করা হয়। লাজুক ব্যক্তিরা অন্যদের সামনে অস্বস্তি বোধ করে কিন্তু তাদের কোন সামাজিক পরিবেশে অত্যন্ত উদ্বিগ্নতা হয় না এবং তারা সাধারণত এই ধরণের পরিস্থিতি এড়িয়ে নিজের অস্বস্থি কমানোর চেষ্টা করে না। অন্যভাবে সামাজিকভাবে ভীত ব্যক্তি সবসময় লাজুক নয় বরং তারা কিছু মানুষের সামনে বেশীরভাগ সময় পুরোপুরি সহজ হতে পারে। সামাজিকভাবে ভীত ব্যক্তিরা সাধারনত দুশ্চিন্তা ও আতঙ্কের বিষয়কে এড়িয়ে চলে এবং এটি এত বেশী মাত্রায় হয়ে পড়ে যে ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবন এতে বাধাগ্রস্থ হয়। এটি তাদের জীবনযাপন, জীবিকা, সামাজিক যোগাযোগ সব কিছুতে বাধার সৃষ্টি করে। এই ধরণের অসুস্থতার ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি বা মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ভালো সুফল পাওয়া যায়।

৩. মুক্তস্থানাতঙ্ক/ ভিড়ের প্রতি ভীতি
এই ধরণের উদ্বিগ্নতা বৈকল্য হলে ব্যক্তি জনসমাগমে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে যেখান থেকে সে সহজে বের হতে পারে না। এই রোগটি খুব তীব্র কারণ এই রোগীরা প্রায়ই প্যানিক অ্যাটাক বা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে এবং এরা সাধারণভাবেই তাদের ভয়ের স্থান এবং বিষয় এড়িয়ে চলে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বাসায় একা থাকতে, বাহিরে একা একা যেতে, ভিড়ের মধ্যে যেতে, যানবাহনে ভ্রমণ করতে, লিফ্ট বা ব্রিজে উঠতে ভয় পায়। ভীড়ের প্রতি ভীত ব্যক্তিরা সাধারণত ভিড়ের স্থান যেমন রাস্তা, জনসমাগম, দোকান, মেলা, সিনেমা হল ইত্যাদি জায়গা এড়িয়ে চলে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরপর কয়েকবার কোন যোগসূত্র ছাড়াই প্যানিক অ্যাটাক হয় এবং কোন বিষয়টি এটির কারণ তা ধারণা করাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং যোগসুত্র ছাড়া প্যানিক অ্যাটাক ভবিষ্যতে এরূপ হবার ভয় তৈরি করে এবং এমন পরিস্থিতির প্রতি ভয় তৈরি করে যেখানে এটি আবার হতে পারে। এই ভিড়ের প্রতি ভীতি এত প্রকট হতে পারে যে ব্যক্তি তার নিজের বাসার বাহিরে কোথাও বের হতে পারে না।

৪. শূচিবায়ূ :
এটি একটি উদ্বিগ্নতা বৈকল্য। এই অসুস্থতার মূল লক্ষণ হচ্ছে ক্রমাগত বদ্ধ ধারণা,প্রায়ই অযৌক্তিক ধারণা, অনিয়ন্ত্রিত ধারণা, ভয়, দুশ্চিন্তা এবং এমন কোন কাজ ক্রমাগত করে যাওয়া যা এই অস্বস্তি থেকে সাময়িক পরিত্রান ঘটায়। এই রোগের একটি খুব পরিচিত উদাহরণ হচ্ছে একজন ব্যক্তির স্থায়ী, ক্রমাগত এবং অনিয়ন্ত্রিত ধারণা হচ্ছে যে সে অপরিচ্ছন্ন, রোগবাহিত, নাপাক, অশূচি এবং এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি প্রতিনিয়ত হাত ধুতে থাকে এবং প্রতিবার ঐ চিন্তা থেকে সাময়িক মুক্তি পায়। এই রোগে অসুস্থ ব্যক্তির সমস্যা এত প্রকট হয়ে পড়ে যে এটি তার দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা দেয়, এক কাজ বারবার করতে হয়, কোন কিছু বারবার চেক করতে হয় এবং এটি তার জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হয়ে পড়ে। শুচিবায়ু থেকে পরিত্রাণের জন্য ঔষধ সেবন করতে হয় তবে তাদের আচরণ, চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার কিছু কৌশল, তাদের দুশ্চিন্তার সাথে মোকাবিলা করা এবং এই চিন্তার পিছনে লুকানো বিষয় গুলো খুঁজে বের করতে সাইকোথেরাপি কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

স্কিজোফ্রেনিয়া
সাধারণত বয়সন্ধিকালের শেষের বছরগুলোতে এবং বয়স বিশের ঘরের প্রথমার্ধে দেখা দেয়। নারীর তুলনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে এই রোগের লক্ষণগুলি আগে দেখা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে ভ্রান্ত ধারণা এবং দৃষ্টিবিভ্রম, শ্রুতিবিভ্রম, অগোছালো, আচরণ বা কথাবার্তায় অসংগতি দেখা যায়। এটি বাড়তে বাড়তে একটা সময় নিজের মধ্যে গুটিয়ে যাওয়া, অনুভূতির সাথে আচরণের মিল না থাকা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। এই ধরণের রোগীদের জন্য অতিসত্ত্বর ঔষধ শুরু করাটা জরুরী।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (Post Traumatic Stress Disorder PTSD)
যে সমস্ত সারভাইবার অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন অথবা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় তাদের মধ্যে বিভিন্ন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

PTSD হচ্ছে তেমনি একটি মানসিক অসুস্থতা যার মূলে ব্যক্তির ভয়াবহ নেতিবাচক অভিজ্ঞতা কাজ করে । PTSD আক্রান্ত ব্যক্তির মাঝে ফ্ল্যাশব্যাক, দুঃস্বপ্ন, দুশ্চিন্তা দেখা দেয় সেই সাথে ব্যক্তির এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পূনঃপুনিক চিন্তার ওপর ব্যক্তির কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এই ধরণের উপসর্গ সময়ের সাথে সাথে কমে আসতে পারে যদি যথাযথ মানসিক সেবা নিশ্চিত করা যায়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক মাস এমনকি বেশ কিছু বছর ধরে ঐ চিন্তা, দুঃস্বপ্ন ও অতীতের ঘটনা পূনঃ অনুভব করতে থাকে।

PTSD নারীদের মধ্যে পুরুষের চাইতে প্রায় দ্বিগুণ আকারে বিদ্যমান। এটি যেকোন বয়সের ব্যক্তির মধ্যে দেখা দিতে পারে। চঞঝউ আক্রান্ত ব্যক্তির মাঝে হতাশা, ড্রাগ/মাদকের নেশা, অন্যান্য উদ্বেগজনিত রোগ সহজে সংক্রমিত হতে পারে।

কোন ব্যক্তিকে PTSD আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য তার মাঝে কিছু উপসর্গ চিহ্নিত করতে হবে। এই উপসর্গগুলো অন্তত এক মাস বা তার অধিকসময় স্থায়ী হলে এবং তা ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে চঞঝউ আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
এই রোগের চিহ্নগুলো নিম্নরুপ :

– ঘটনাটি মনে পড়লে ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া হয়। সাধারণত দুঃস্বপ্ন, মনখারাপ, দুঃশ্চিন্তা অথবা ফ্ল্যাশব্যাক ইত্যাদি ব্যক্তিকে সে বেদনাদায়ক এবং ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুহুর্তে ফেরত নিয়ে যায়।
– যে ঘটনা, অবস্থা, কাজ ও পারিপার্শ্বিকতা ব্যক্তির ঐ নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে মনে করিয়ে দেয় সেগুলো থেকে সে দূরে থাকতে চায়। কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যক্তি প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে পড়ে এবং পূর্বস্মৃতি মনে করতে পারে না।
– প্রাত্যহিক কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং নিঃসঙ্গবোধ করে।
– PTSD আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত ভবিষ্যত নিয়ে ভালো কিছুর সম্ভাবনা স¤পর্কে ভাবতে পারেনা।
– PTSD আক্রান্ত ব্যাক্তি সবসময় অতি উদ্বেগগ্রস্থ থাকতে পারে। তাদের কেবলি মনে হয় যে, দুর্ঘটনা থেকে আত্মরক্ষার জন্য সর্বদা সচেতন থাকা প্রয়োজন। ফলে ঘুমের সমস্যা, মেজাজ খিটমিট করা, মনোযোগের অভাব, অতিমাত্রায় আহার করা এবং দ্রুত রোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো ইত্যাদি তাদের মধ্যে দেখা দেয়। মাথার যন্ত্রণা, হজমের গন্ডগোল, ঘুমের সমস্যা, রোগ প্রতিরোধের অভাব, বুকের ব্যথা ইত্যাদি এদের ক্ষেত্রে খুবই বেশি দেখা যায়।
– ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাথে সাথে খুব দ্রুত ব্যক্তিকে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনার সুযোগ করে দিলে রোগের উপসর্গগুলো কিছুটা কমাতে সহায়তা করে।

৩.২ : হ্যান্ডআউট

বিভিন্ন বয়সে মানসিক সমস্যা
মানসিক সমস্যা যেমন বিভিন্ন ধরনের হয় তেমনি বিভিন্ন বয়স অনুযায়ী বা বয়স ভেদে সমস্যার ধরণও বিভিন্ন হয়ে থাকে।
বয়স ভেদে মানসিক সমস্যাকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে :
(১) শিশুদের সমস্যা
(২) প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা
(৩) বয়স্ক ব্যক্তিদের সমস্যা

১. শিশুদের মানসিক সমস্যাকে আবার বয়সের ক্রম অনুসারে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। জন্মের পর থেকে ১২ এবং ১৩ থেকে ১৮।
আসলে শিশুদের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যা না বলে আবেগীয় আচরণগত সমস্যা বললে ভালভাবে বোঝা সম্ভব হয়। আচরণগত সমস্যার মধ্যে আছে অতিসক্রিয়তা (Hyperactive), অত্যধিক জিদ করা, অবাধ্যতা, অপরাধ প্রবনতা, চুরি করা, খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করা, অন্যকে মারধর করা, বিছানায় প্রসাব করা, রাগ, তেতলামী, অতিরিক্ত ভয় বা নার্ভাসনেস, বিষন্নতা, স্কুলে না যাওয়া বা স্কুল ভীতি, পড়াশোনা সংক্রান্ত সমস্যা, ব্যথা (মাথা ব্যথা বা পেট ব্যথা) অটিসম ইত্যাদি।

২. প্রাপ্তবয়স্ক অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮ থেকে ৬০/৬৫ এর মধ্যে তাদের ক্ষেত্রে যেসব মানসিক সমস্যা দেখা যেতে পারে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: অতিরিক্ত ভয় এবং দুঃশ্চিন্তা, বিষন্নতা, সামাজিক ভীতি, শুচিবায়ু বা অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে স্বভাব, আন্তঃব্যক্তিক অর্থাৎ অন্যান্যদের সাথে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে অসুবিধা বা অপারগতা, আত্মহত্যার প্রবণতা, মাদকাসক্তি, মানসিক কারণে যৌন সমস্যা ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে মাথা ব্যথা বা শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা।

৩. বয়স্ক ব্যক্তিদের সমস্যায় দেখা হয়, যারা ৬০/৬৫ বছরের উপরে যাদের বয়স এবং তারা যেসকল মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত বা সম্মুখীন হয়, যেমন – নারীদের মেনোপজকে ঘিরে মানসিক অবস্থা, ডিমেনসিয়া, আলঝাইমার-সহ অন্যান্য মানসিক রোগ। এছাড়াও, কাজে অবসর, বাড়ীতে একা থাকা, সঙ্গীর মৃত্যু, দেখাশোনার কেউ না থাকা, ওষুধ বা খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা না থাকা-সহ নানাবিধ পারিবারিক বা সামাজিক বিষয়ে ব্যক্তি মানসিক সমস্যায় পড়ে থাকেন, যার জন্য সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে।