অধিবেশন-১১ : একটি সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা
অধিবেশনেরউদ্দেশ্য:
এই অধিবেশন শেষে আপনি –
১. ধারণা পাবেন বা বুঝতে পারবেন, হঠাৎ কোন সংকটকালীন পরিস্থিতিতে কিভাবে নিজে ঠিক থাকবেন ও অন্যদেরও ঠিক থাকতে সহায়তা করবেন এবং তার সম্ভাব্য উপায়গুলো কি কি
২. এ ধারণার মাধ্যমে, সংকটে আছেন এমন ব্যক্তির মানসিক অবস্থা বুঝতে কিছুটা সমর্থ হবেন।
সঙ্কটকালীন পরিস্থিতি:
প্রতিটি মানুষ জীবনে কিছু সঙ্কটকালীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন এবং এটাই স্বাভাবিক। যেমন- কোন দূর্ঘটনা, দূর্যোগ, সম্পর্কে জটিলতা, সহিংসতার শিকার ইত্যাদি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সঙ্কটকালে মানুষের যে যে প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে তা স্বাভাবিক, কেননা এরকম অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এমন হতেই পারে। কার্যকরীভাবে সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে সাহায্য করতে গেলে এমন তথ্য, কার্যকলাপ ও পরিকাঠামো দেওয়া দরকার যাতে সঙ্কট অতিক্রম করে মানুষ আবার তার আগের মানসিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
সঙ্কটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মূল কথা হলো সঙ্কটের মুখোমুখি হতে পারা। বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার যে সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সহায়তা করতে গিয়ে তা যেন মানুষটির সমস্যাকে দীর্ঘায়িত না করে এবং মানুষটির নিজের ও আশেপাশের অন্যমানুষের জীবনে আরো সমস্যা ডেকে না আনে। পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া ও আলোচনা করা সঙ্কটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলার অন্যতম উপায়।
সঙ্কটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলার ৮ টি প্রয়োজনীয় উপাদান নীচে উল্লেখ করা হলো:
ক. শিক্ষা- বেশিরভাগ মানুষেরই সঙ্কটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে বেরিয়ে আসতে পারার একটা সহজাত ক্ষমতা থাকে। তবে এর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়তা, নির্দেশনা ও বিভিন্ন উপায় থাকাও দরকার।
খ. পর্যবেক্ষণ ও সচেতনতা- সঙ্কট নানা কারণে আসতে পারে, যেমন-আত্মসচেতনতার অভাব, নিজের বা অন্যদের উপর নিজের ব্যবহারের প্রভাব। সচেতন থাকলে অনেক উপায় খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে ভালো থাকা সম্ভব হয়। সমস্যার দিকে না তাকালে এবং সমস্যার/নিজের দায় স¤পর্কে সচেতন না হলে সমস্যার মোকাবেলা করা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে, পরিবারের নিজস্ব গঠনগত ও ভাবের আদান প্রদানগত সমস্যা সঙ্কটকে দীর্ঘায়িত করে।
গ. নিজের সক্ষমতা প্রকাশ ও প্রয়োগ- প্রতিটি সঙ্কটকালীন পরিস্থিতি ব্যক্তিগত বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি করে এবং ব্যক্তির মধ্যে সর্বোচ্চ সুপ্ত সম্ভাবনার প্রকাশ করে।সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে যে নিজেকে খুব সাহসী বলে মনে করে শুধুমাত্র সেই সফল মানুষ হবে এমন নয় বরং জীবনে অপরিহার্য এবং দুঃখজনক ঘটনার মুখোমুখি হয়ে নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা গুণ ও যোগ্যতার ব্যবহার করে সঙ্কটকালিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে, সেই প্রকৃতভাবে সঙ্কটঅতিক্রমকারী সফল মানুষ।
যদিও সহায়তার প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সংকটের মধ্যে থাকা মানুষটিকে সুযোগ দেওয়া হবে না বা উৎসাহিত করা হবে না বা তার নিজের জীবনের সঙ্কট মোকাবিলা বা গুণগত মান উন্নয়নে তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হবে না।
ঘ. নিজের সমস্যা বোধগম্য হওয়া- প্রত্যেক মানুষেরই মূল লক্ষ্য থাকে সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উপায় ও যোগ্যতার সর্বোত্তম ব্যবহার করা। যেকোনো সঙ্কটকালে প্রকৃত ও মনের গুরুত্বপূর্ণ ইচ্ছা বা অভিপ্রায়কে চিহ্নিত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিপ্রায়টা মনে রাখা খুব দরকার। আপনি কি করছেন বা কতটা দক্ষতার সাথে করছেন, সেটা বড় কথা নয়। যদিও সাধারণত আমাদের অভিপ্রায় থাকে জীবনকে আরো সুন্দর করে তোলা, কখনও কখনও আমাদের ব্যবহার ভুল পথে চালিত হতে পারে, লোকে ভুল বুঝতে পারে বা যতটা আমরা আশা করছি ততটা কার্যকরী নাও হতে পারে।নিজেকে বোঝা এবং অন্যরা আমাদের কিভাবে দেখে, তার মধ্যে নিজেকে পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ চাবি লুকিয়ে থাকে।
ঙ. প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো / নিরাপদ স্থানের উপযুক্ত পরিবেশতৈরি করা- সঙ্কটকালীন পরিস্থিতির মোকাবেলা ও সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ দিকএকটা সামাজিক পরিবেশে’র ব্যবস্থা করা, যেখানে মানুষ নিজেকে নির্ভয়ে প্রকাশ ও অনুসন্ধান করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় সে যেন সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে সক্রিয়ভাবে নিজেকে মুক্ত করতে পারে।
চ. অযৌক্তিক বিশ্বাস এবং অবাস্তব প্রত্যাশাকে বাস্তবমুখীকরা- কিছু মানুষের সঙ্কটকালে এমন প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকে যারা নিজেদের এবং অন্যের চিন্তাভাবনা,কল্পনা, প্রত্যাশা বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু আমরা বেশীর ভাগই আমাদের নিজেদের চিন্তা-ভাবনা,অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া অন্যের উপর নিজেদের অজান্তেই চাপিয়ে দিই।
ছ. দুষ্ট চক্র ও আসক্তির অভ্যাসকে নষ্ট করা- বেশিরভাগ সঙ্কটকালীন সময়ে কিছু দুষ্ট চক্র ও আসক্তি থাকে। উদাহরণ স্বরূপ, নেশা ও মাদক দ্রব্যাদির ব্যবহার শুধুমাত্র আমাদের জীবনকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায় না এটাআমাদের নিজেদের, অন্যদের বা আশপাশের পৃথিবী স¤পর্কেও আমাদের বোঝাপড়ায় ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে। যখন অনুভূতিগুলো রাসায়নিক দ্রব্য, ঔষধ পত্র, মাদকদ্রব্য, ও অন্যান্য নেশাদ্রব্য দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন মানুষ নিজেদের অনুভূতি বুঝে উঠতে পারে না। সাধারণত এই ধরণের রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহারে যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়।
নিজেকে অন্যের জায়গায় দাঁড় করিয়েতাঁর সংকটবুঝেসাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় যে সঙ্কটের মোকাবেলা না করে সঙ্কটকে দীর্ঘায়িত করলে কিছু সহানুভূতিশীল বন্ধুত্ব তৈরি হতে পারে। যখন কোন মানুষ অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে ও সে তখন একটা দুষ্ট চক্রে জড়িয়ে পড়ে। দুষ্ট চক্রের মধ্যে যেব্যবহার, আচরণ দেখা যায় বাস্তবে তা সঙ্কটকে দীর্ঘায়িত করে এবং ব্যক্তিকে সক্রিয় ও স্বনির্ভর হতে বাধাঁগ্রস্থ করে।
সাময়িক নির্ভরশীলতা তৈরি করে- সঙ্কটকালে, কখনও কখনও অন্যদের সাথে স্বল্পকালীন স¤পর্ক সহায়ক হয়। সঙ্কটকালীন মোকাবেলা ও সাহায্য খুবই উপকারী ও প্রয়োজনীয়। সুস্থ নির্ভরশীলতার স¤পর্ক সাধারণত সাময়িক হয় এবং ব্যক্তিকে স্বাবলম্বী হওয়ায় উদ্বুদ্ধকরে। অস্বাস্থ্যকর নির্ভরশীলতা দীর্ঘকাল চলতে থাকে এবং স্বাবলম্বীতার পরিবর্তে নির্ভরশীলতাকে প্রশ্রয় দেয়।
মানসিক ভীতির মুখোমুখি হওয়া- সংকটকাল বলতে আমরা ভয় বা দুঃখের সময়কে বুঝি। এই পরিস্থিতিতে আমরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া করি তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ভয় বা দুঃখ তৈরী হয়ে থাকে। যখন আমরা আমাদের জীবনে অন্ধকার দিনের মুখোমুখি হই তখন আমরা বেঁচে থাকার বিকল্প পথ বের চেষ্টা করি। সময়ের সাথে সাথে আমরা অনুভব করি, আমাদের মানসিক যন্ত্রণা ধারণ করার ক্ষমতা বাড়তে থাকে।
মানসিক যন্ত্রণা এড়িয়ে না চলে এর মুখোমুখি হওয়াটাই সুস্থ প্রক্রিয়া। কিন্তু চিন্তা ও অনুভূতিগুলিকে নিয়ন্ত্রনের জন্য নিজেকে কাজে বা যে কোন কর্মকান্ডে একাগ্রচিত্তে নিমগ্নরাখা জরুরী।যখন মানুষ যন্ত্রণা ভোগ করে, তখন সে যাতে নিজেকে একা না ভাবে তার জন্য তাকে সাহায্য করা দরকার। মানসিক যন্ত্রণার সময় মানুষকে সহায়তা করা ও শক্তিমান করে তোলারজন্য পদক্ষেপ প্রয়োজন হয়।
আশাকরি উপরের দেওয়া তথ্যগুলোআপনি পড়েছেন এবং সেগুলো ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবেন।
